বিটিপিটি

শিখন ও শিখনক্ষেত্র

শিখনের ক্ষেত্র (Blooms Learning Domain) কী? এর প্রকারভেদ

শিখনের ক্ষেত্র কী ?

শিক্ষা মানেই হচ্ছে আচরণের কাঙ্খিত পরিবর্তন। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ প্রফেসর বেঞ্জামিন স্যামুয়েল ব্লুম ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী মিলে ১৯৫৬ সালে Taxonomy of Educational Objectives নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। উক্ত গ্রন্থে শিখনের আলাদা আলাদা ক্ষেত্র ( Learning Domain) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

তাঁদের মতে ব্যক্তি যেভাবে শেখে তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবে শিখনের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যবস্তু (Goal) নির্ধারণ করা গেলে তার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির শিখনের অগ্রগতি (Performance) পরিমাপ করা সম্ভব। ব্লুমের মতে একটি বিষয়বস্তু থেকে শিক্ষার্থী শুধু জ্ঞানই অর্জন করে না বরং ঐ জ্ঞান সংশ্লিষ্ট আরও অনেক দক্ষতা অর্জন করে থাকে।  

ব্লুম শিখনের ক্ষেত্রকে ৩ ভাগে বিভক্ত করেছেন। যেমন-

১. বুদ্ধিবৃত্তিক বা জ্ঞানমূলক ক্ষেত্র (Cognitive Domain),

২. আবেগিক ক্ষেত্র (Affective Domain) এবং

৩. মনোপেশীজ ক্ষেত্র (Psychomotor Domain)

শিখনের সাথে এই ক্ষেত্রগুলোর সম্পর্ক

বেঞ্জামিন স্যামুয়েল ব্লুম দেখিয়েছেন, শিখন প্রক্রিয়াটি যে ক্ষেত্রেই (Domain) ঘটুক না কেন তা ধাপে ধাপে বা স্তরে স্তরে সম্পাদিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাবিজ্ঞানী এ বিষয়ে আরো গবেষণা করে ব্লুমস এর তত্ত¡কে সংশোধন করে নতুন ধারণা প্রদান করেন। নিচে পর্যায়ক্রমে শিখনক্ষেত্রগুলো আলোচনা করা হলো।

বুদ্ধিবৃত্তিক/জ্ঞানগত বা চিন্তন দক্ষতার ক্ষেত্র (Cognitive Domain)

জ্ঞান এবং এর বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা বুদ্ধিবৃত্তিক/জ্ঞানগত ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রের উৎস হচ্ছে মস্তিষ্ক। বিভিন্ন উৎস থেকে যেমন: মানুষ বই/পত্রিকা পড়ে, সিনেমা-নাটক দেখে, কোনো অনুষ্ঠান বা আলোচনা শুনে নিজের মধ্যে যে জ্ঞানমূলক দক্ষতা তৈরি করে তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র বা চিন্তন দক্ষতার ক্ষেত্র বলে।

বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি শিশু পাঠ্যবই বা অন্য কোনো শিখন উৎস থেকে কোনো কিছু মুখস্থ করে, বুঝে পড়ে এবং কোনো ধারণা, ত্ত্ব, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া প্রভৃতি নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে। আবার কোনো  ধারণা, ত্ত্ব, সূত্র, পদ্ধতি, প্রক্রিয়ার জ্ঞান বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। কখনো বা প্রয়োজনে এগুলোকে বিশ্লেষণ করে। বিশ্লেষণী বিষয়কে সারসংক্ষেপ করে এবং ভালো-মন্দ বিচার করে মূল্যায়ন করে। এই কাজগুলো সব মস্তিষ্কপ্রসূত কাজ।

শিক্ষার্থী শিখনকালীন সময়ে কোনটি স্মৃতিতে ধরে রাখে, কোনটি বুঝে পড়ে ও লিখিত আকারে প্রকাশ করে, কোনটি বুঝতে পারলে বাস্তবজীবনের সাথে মিলিয়ে প্রয়োগ করতে পারে। আবার কোনটির বিস্তৃত বর্ণনা থেকে সারসংক্ষেপ করে এবং কোনটি বিস্তৃত বর্ণনা থেকে ভালো ও মন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত প্রদান করতে পারে। এসবগুলোই বুদ্ধিবৃত্তিক শিখনক্ষেত্রের সাথে ওতোপ্রোতভাবে সম্পর্কিত।

 আবেগীয় শিখনক্ষেত্র (Affective Domain)

বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রের মূলনীতি হলো Ôfrom simple to complex’ এবং Ôfrom concrete to abstract’ যা মূলত শিক্ষার্থীর জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু শিক্ষার্থীর মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে এর কোনো ভূমিকা নেই। শিক্ষার্থীর আবেগিক ক্ষেত্রের উন্নয়নের কতগুলো শৃঙ্খলিত নীতি রয়েছে। যা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের বিকাশকে প্রভাবিত করে। এই নীতিগুলো হলো -

১.  গ্রহণ নীতি (receiving): শিক্ষার্থী সুনির্দিষ্ট উদ্দিপক এবং অবস্থার অস্তিত্বের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রকাশ করে যা স্বতঃস্ফর্তভাবে গ্রহণ এবং অংশগ্রহণের মাধ্যমে বোঝা যাবে। এ অংশগ্রহণ অথবা গ্রহণ তিনভাবে ঘটে থাকে। যেমন, সচেতনভাবে, স্বতস্ফূর্তভাবে এবং সুস্পষ্ট মনোযোগের মাধ্যমে।

২.  সাড়া প্রদান (responding) নীতি: উক্ত অবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত আচরণ, সক্রিয় অংশগ্রহণ করা এ নীতির মূল উদ্দেশ্য। এ নীতি অনুযায়ী শিক্ষার্থী উদ্দিপকের/অবস্থার প্রতি সাড়া বা আচরণ প্রকাশ করে। এ সাড়া প্রদর্শন ঘটবে মৌনভাবে, সক্রিয় প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে এবং সাড়া প্রদানে সন্তুষ্টিবোধ করে।

৩.  মূল্যবোধ গ্রহণ, পছন্দকরণ এবং মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা (valuing): এই নীতি অনুযায়ী শিক্ষার্থী পরিস্থিতি বা উদ্দীপক হতে মূল্যবোধ গ্রহণ করে এবং ঐ সুনির্দিষ্ট মূল্যবোধে আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ হয়, যা এক পর্যায়ে তার আচরণে স্থায়ীরূপ লাভ করে এবং এই মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে। 

৪.  সংগঠন নীতি (organizing) কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক একাধিক মূল্যবোধকে সংগঠিত করাই এ নীতির মূল উদ্দেশ্য। যে মূল্যবোধগুলো অত্যধিক ক্রিয়াশীল ও প্রভাবশালী সেগুলোর সমন্বয়েই শিক্ষার্থী মধ্যে একটি মূল্যবোধ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

 মনোপেশিজ শিখনক্ষেত্র (Psychomotor Domain)

মন এবং পেশিজ আচরণের সমন্বিত আচরণই মনোপেশিজ আচরণ। যেমন- প্রত্যক্ষণের ক্ষেত্রে সংবেদন ব্যতীত কোনো প্রত্যক্ষণ হয় না। এ ক্ষেত্রে আমাদের অনুভতির অঙ্গগুলো সংকেত লাভ করে যা পেশির কার্যাবলিকে পরিচালিত করে। যেমন, আমরা যন্ত্রের শব্দ দ্বারা যন্ত্রের স্বাভাবিক কাজের ব্যর্থতা চিনতে পারি বা বুঝতে পারি। গানের সাথে নাচের তাল সম্পর্কিত করতে পারি।  এ শিখনে শিক্ষার্থীর মানসিক, শারীরিক এবং আবেগিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় এবং শিক্ষার্থী সুনির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রের প্রত্যক্ষণ হবে নিখুঁত যা মানসিক, শারীরিক ও আবেগিক সেটের মাধ্যমে প্রতিভাত হবে।

 কোনো পেইন্টিং বা ডিজাইনের কাজ নিখুঁতভাবে আঁকতে হলে শিক্ষার্থীর মানসিক, শারীরিক ও আবেগিক এই তিনটি ক্ষেত্রেরই প্রত্যক্ষণ এবং বিভিন্ন কাজের (ধপঃরড়হ) সমন্বয় প্রয়োজন হয়। তবে এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া (guided response) থাকতে হয়। নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া মূলত বাল্য শিখন স্তরের জটিল দক্ষতা অর্জনের সাথে সম্পর্কিত। শিখনে অনুকরণ (imitation), প্রচেষ্টা ও ভুল (ঃৎরধষ ধহফ বৎৎড়ৎ) এই স্তরে ঘটে থাকে। যা দক্ষতা অর্জনের একটি পর্যায়। আঁকার অনুকরণ এবং বারবার প্রচেষ্টা ও ভুল (trial and error) করার মধ্য দিয়ে একসময় শিক্ষার্থী জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এভাবে শিক্ষার্থী আত্মবিশ্বাসী এবং দক্ষ হয়ে উঠে। এই দক্ষতা শিক্ষার্থীকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে বা সমস্যার সমাধানে তার আচরণ পরিবর্তনে সহায়তা করে। 

রং তুলির কাজ শিক্ষার্থী বাল্যকাল থেকেই শুরু করে। আম, কলা আঁকতে আঁকতে এক সময় সুন্দর প্রকৃতির ছবি আঁকে। এক সময় অনুকরণ করে, আবার নিজে নিজে আঁকে কখনো বা ভুল করে আবার চেষ্টা করে। চেষ্টার মাধ্যমে একসময় যখন নতুন কিছু একটা করতে পারে, তখন প্রশংসা পেতে শুরু করে এবং এটি ঝোঁকে রূপান্তরিত হয়।  যুক্ত হয় মানসিক, শারীরিক ও আবেগিক তাড়না ও প্রস্তুতি। একসময় শিক্ষার্থীকে কাজে বিশ্বাসী, আত্মপ্রত্যয়ী ও দক্ষ করে তোলে। এমন একদিন  আসে যেদিন শিক্ষার্থী জটিল ধরনের ডিজাইন করতে পারে এবং নতুন নতুন আকর্ষণীয় পেইন্টিং করতে পারে।  আবার সাঁতার শেখার অভিজ্ঞতাও একসময় এমন হয় সাঁতারু পানির টানের সাথে সাঁতার, সাঁতারের ধরন পাল্টে নেয়া বা পরিবর্তন করতে পারে। সর্বশেষে যেকোনো নতুন পরিস্থিতিতে নতুন আচরণ বা আচরণের ধরন পাল্টে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারে। সাঁতারের দক্ষতার মাধ্যমে বিশ্ব রেকর্ডও গড়ে তুলতে পারে।

মতামত দিন

নিউজলেটার

থাকার জন্য আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।