জ্যাঁ পিঁয়াজের বুদ্ধিবৃত্তিক বা জ্ঞানীয় বিকাশের তত্ত্ব
জ্যাঁ পিঁয়াজের বুদ্ধিবৃত্তিক বা জ্ঞানীয় বিকাশের তত্ত্ব কী?
সুইজারল্যান্ডের প্রখ্যাত মনোবিদ জ্যাঁ পিঁয়াজের মতবাদ অনুসারে শিখনের সময় আমরা একটা সমস্যার সম্মুখীন হই। সমস্যাপূর্ণ পরিবেশে ব্যক্তি বা প্রাণি নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির সাহায্যে গোটা পরিস্থিতির একটি ছবি মানসপটে এঁকে নিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা করে। এই সমস্যা সমাধানের অর্থই হল শিখন। পিঁয়াজের মতে, একটি শিশুর বুদ্ধি বিকাশ হচ্ছে ক্রমশ জটিল মানসিক কাঠামোর গঠন প্রক্রিয়া এবং এটিকে তিনি ‘স্কিমা’ (Schema)- বৃত্তীয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। স্কিমা হলো একটি ধারণা বা কাঠামো যা ব্যক্তির মনের মধ্যেই থাকে এবং যার দ্বারা তথ্য সুশৃঙ্খলিতকরণ ও বিশ্লেষণ করে। পিঁয়াজের মতে, শিশুরা সক্রিয়ভাবে তাদের চারপাশের পরিবেশ অনুসন্ধান করে (exploration) এবং পরিবেশের বিদ্যমান উপকরণসমূহ দক্ষতা সহকারে ব্যবহারের (manipulation) মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজস্ব জ্ঞান অর্জন করে।
পিঁয়াজের মতানুযায়ী শিশুর মানসিক বিকাশ একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী অগ্রসর হয় অর্থাৎ তার জ্ঞান বয়সের ৪ টি নির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়। জ্ঞান বিকাশের এই ধাপ বা স্তরগুলোর প্রত্যেকটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং একটির সাথে অপরটির বিশেষ গুণগত পার্থক্য রয়েছে।
শিশুর জ্ঞান বিকাশের এই ধাপসমূহ
১. ইন্দ্রিয় পেশীর সমন্বয় কাল (Pre-operational period): ০-২ বছর
২. প্রাক-প্রয়োগিক কাল (Pre-conceptual period): ২-৭ বছর
৩. বাস্তব প্রায়োগিক কাল (Concrete operational period); ৭-১০/১১ বছর);
৪. রীতিবদ্ধ প্রয়োগিক কাল (formal operational period): ১১/১২-১৫/১৬ বছর)।
জ্যাঁ পিঁয়াজের শিশু বিকাশের স্তরগুলো বর্ণনা করুন।
জ্যাঁ পিঁয়াজে শিশু বিকাশের স্তুরগুলোকে ৪টি ধাপে বর্ণনা করেছেন। নিম্নে বিকাশের স্তুরগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো:
১. ইন্দ্রিয়-পেশীর সমন্বয়কাল (Pre-operational period): শিশুর জন্ম থেকে ২ বছর
এই পর্যায়ে একটি শিশুর মাঝে দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়,
১. বস্তুর স্থায়ীত্বের ধারণা ও শিশুর সামনে থেকে কোনো কিছু সরিয়ে নিলে সে বস্তুটি কোথায় আছে সে সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয় (Object permanence)।
২. লক্ষ্যাভিমুখী আচরণ: এছাড়া শিশু কোনো কিছু দেখলে তা ধরতে চায় এবং সেদিকে অগ্রসর হয় (Goal directed actions)।
২. প্রাক প্রয়োগিক স্তর: ২ থেকে ৭ বছর
তিনি প্রাক-প্রায়োগিক আবার স্তরকে ২ টি স্তরে বর্ণনা করেছেন। যথা:
ক) ধারণা স্তর (২ থেকে ৪ বছর)
পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি প্রতীকী চিন্তা করার দক্ষতা বাড়ে। শিশুরা অনেক বেশী অনুকরণ এবং অনুসরণ করে। বুদ্ধির প্রতিফলন ঘটে- প্রতীক,ভাষা,স্মৃতির ব্যবহারের মাধ্যমে এবং এগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বিকাশ ঘটে, তবে চিন্তা থাকে অযৌক্তিক ও একমূখী বা এককেন্দ্রিক। আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা শিশুকে অনেক বেশি প্রভাবিত করে। শিশুর মধ্যে প্রতীকী খেলার সূচনা হয়। যেমন-শিশু লাঠির ওপর ভর দিয়ে লাঠিকে ঘোড়া হিসেবে ব্যবহার করে।
খ) উপলব্ধির স্তর/ মূর্ত প্রতীক স্তর (৪ থেকে ৭ বছর)
এ স্তরে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার অবসান ঘটে, প্রয়োগিক চিন্তা বিকাশিত হয়। এ বয়সী শিশুদের মধ্যে নতুন নতুন মানসিক ক্ষমতা ও যোগ্যতার বিকাশ ঘটে। উপলব্ধির স্তরে বুদ্ধির প্রকাশ ঘটে যৌক্তিক চিন্তা এবং বাস্তব বস্তুর সাথে সম্পর্কিত প্রতীকের সুশৃঙ্খল ও দক্ষতার সাথে ব্যবহারের মাধ্যমে। মূর্ত প্রয়োগিক স্তর সাত ধরনের সংরক্ষণের বৈশিষ্ট্য মন্ডিত, যেমন- নম্বর, দৈর্ঘ্য, তরল, ভর, উচ্চতা, ক্ষেত্র বা ভূমি এবং পরিমাণ।
৩. বাস্তব প্রায়োগিক স্তর (Concrete operational period): ৭-১০/১১ বছর
এ বয়সে শিশুরা যৌক্তিক এবং বাস্তবতার প্রেক্ষিতে যুক্তি বিচার করার ক্ষমতা অর্জন করে। বাহ্যিক ঘটনার প্রতি সচেতন হয় এবং বুঝতে শুরু করে যে একেক জনের চিন্তা ও অনুভূতি অনন্য। অন্যের কাছে বলা যায় না, হতে পারে অবাস্তব। এ পর্যায়ে তারা বিমূর্তভাবে বা অনুমান করে চিন্তা করতে পারে না।
৪. রীতিবদ্ধ প্রায়োগিক স্তর (Formal operational period): ১১/১২-১৫/১৬ বছর
রীতিবদ্ধ প্রায়োগিক স্তরে বুদ্ধি ও যুক্তির সমন্বয়ে কিশোর কিশোরীরা এ সময় বিমূর্ত চিন্তা করতে সক্ষম হয়। অনুমিত বিষয়ের সত্যতা যাচাইয়ে তারা বেশ সক্রিয়। এই স্তরে তারা বক্তব্যের ধরন (form) এবং বিষয়বস্তুর মধ্যে সম্পর্ক (relation between contents/subjects) ও পার্থক্য (differentiation) করতে পারে। শিশুর মাঝে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও এই পর্যায়ে হয়ে থাকে। চিন্তাশক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে এই স্তরের কিশোর কিশোরীরা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ধারণা লাভ করে। যারা বোধ বিকাশের এ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তারা যৌক্তিকভাবে সংকেতের ব্যবহার করতে পারে যেমন: বীজগণিত, বিজ্ঞান।
স্কিমা কী?
স্কিমা হলো ক্রিয়ার ধরন বা মানসিক কাঠামো যা জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট। জ্ঞান বিকাশের জন্য এই স্কিমার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। স্কিমা হলো একটি ধারণা বা কাঠামো যা ব্যক্তির মনের মধ্যেই থাকে এবং যার দ্বারা তথ্য সুশৃঙ্খলিতকরণ ও বিশ্লেষণ করে। ছোট শিশুর প্রাথমিক স্কিমা হচ্ছে চোষা। পিঁয়াজের মতে, শিশুরা সক্রিয়ভাবে তাদের চারপাশের পরিবেশ অনুসন্ধান করে (exploration) এবং পরিবেশের বিদ্যমান উপকরণসমূহ দক্ষতা সহকারে ব্যবহারের (manipulation) মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজস্ব জ্ঞান অর্জন করে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, শিশুরা নতুন তথ্য অথবা ধারণা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিদ্যমান চিন্তা-ভাবনাকে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করে এবং এই নতুন তথ্যই পরবর্তীতে তাদেরকে নতুন নতুন বিষয় বুঝতে সাহায্য করে, এভাবেই শিখন সংগঠিত হয়।
অভিযোজন কী?
অভিযোজন (Adaptation) হলো প্রাণি ও পরিবেশের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া (Interaction)। অভিযোজনের দু’টি সম্পূরক ধাপ রয়েছে যা জীবনব্যাপী পরিলক্ষিত হয়, যেমন- আত্মীকরণ (Assimilation) এবং সহযোজন (Accommodation)। শিশু তার স্কিমার সাহায্যে যে কোনো তথ্য নির্বাচন (selection), প্রক্রিয়াকরণ (processing), সংরক্ষণ (conservations) করে থাকে।
আত্মীকরণ কী?
আত্মীকরণ (assimilation) হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান বা তথ্যকে বিদ্যমান স্কিমার সাথে আত্মীকরণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ছোট শিশু অনেক সময় কোন ছাগল দেখে তাকে ‘কুকুর’ বা ‘ভেউ ভেউ’ শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করে। অর্থাৎ সে এই নতুন প্রাণি অর্থাৎ ছাগলটিকে কুকুর স্কিমার সাথে আত্মীকরণ করে ছাগলকে কুকুর বলে মনে করে। আত্মীকরণ বিষয়টি তখনই ঘটে যখন শিশু নতুন অর্জিত জ্ঞানকে পূর্বের জ্ঞানের সাথে সমন্বয় করে। অর্থাৎ শিশু পরিবেশ সম্পর্কে নতুন তথ্য তার স্কিমায় যোগ করে।
মতামত দিন