লেভ ভিগট্‌স্কির সামাজিক-সাংস্কৃতিক তত্ত্ব

লেভ ভিগট্‌স্কির সামাজিক-সাংস্কৃতিক তত্ত্ব কী?

রাশিয়ান বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ভিগট্‌স্কির (Lev Vygotsky ) সামাজিক-সাংস্কৃতিক (Sociocultural) তত্ত্বের প্রবর্তন করেন। ভিগট্‌স্কির শিখন মতবাদের মূলধারণা হলো সামাজিক মিথস্ক্রিয়া (Social interaction) অর্থাৎ সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে সক্রিয় মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর জ্ঞানের কাঠামোতে পরিবর্তনের ফলে তার জ্ঞানমূলক বা বুদ্ধি বিকাশ ঘটে। ভিগট্‌স্কির মনে করেন এই মিথস্ক্রিয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো ভাষা। এছাড়া তিনি তাঁর ‘Thought and Language’ বইতে উল্লেখ করেছেন যে, শিশুরধারণার বিকাশও তার ভাষার ওপর নির্ভরশীল।  তাঁর মতে, চিন্তন (thinking) এবং শিক্ষণ (learning) শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ (inner) এবং স্বতন্ত্র্য (individual) প্রক্রিয়া নয়। এগুলো সাধারণত: বুদ্ধিবৃত্তীয় বিকাশ, ভাষা, সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া (social interaction) এবং সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়।

ভিগট্‌স্কির তত্ত্বের ‘স্ক্যাফোল্ডিং’ শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বিশেষ আবিষ্কার হিসেবে দেখা হয়। তাঁর মতে, স্ক্যাফোল্ডিং হলো শিশুর কোনো সমস্যার সমাধান বা উত্তরণের জন্য প্রদত্ত ধারাবাহিক সহায়তা, যা শিশুর অবস্থান বুঝে ধাপে ধাপে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রদান করা হয়। কিছু কিছু কাজ শিশুদের জন্য একা করা বেশ কষ্টসাধ্য কিন্তু সেই কাজটিই কোনো পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি অথবা একজন অপেক্ষাকৃত অধিক দক্ষ শিশুর সহায়তা নিয়ে তারা সহজে করতে পারে। শিশুর জ্ঞানের এই দুইটি পর্যায়ের ব্যবধানকে তিনি Zone of Proximal Development (ZPD) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সহযোজন কী?

সহযোজন হলো পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে খাপখাইয়ে নেওয়া। অন্যভাবে বলা যায়, সহযোজন প্রক্রিয়ায় পূর্ববর্তী ধারণা বা স্কিমাকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয় যাতে সেটা নতুন ধারণাকে সহজেই তার সাথে মানিয়ে নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, চোষা আচরণের কথা ধরা যাক। জীবনের প্রথম মাসের মধ্যে শিশুরা বিভিন্ন বস্তু (যেমন- স্তনের বোঁটা, আঙ্গুল, দুধ, মধু বা অন্য কিছু) চোষার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করেই তারা বুঝতে শিখে যে, কিছু কিছু বস্তু আছে যা চোষা বা খাওয়া যায়। আবার কিছু জিনিস আছে যা খাওয়া যায় না।

আত্মকেন্দ্রিকতা কী?

আত্মকেন্দ্রিকতা (Egocentrism) হলো একমাত্রিক চিন্তনের ফলশ্রুতি। আত্মকেন্দ্রিকতার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে শিশু নিজে। সে যা ভাবে বা করে সবকিছু তার নিজেকে ঘিরে সম্পাদিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, সে মাকে চিন্তা করে ‘আমার মা’ হিসাবে আর বাবাকে ‘আমার বাবা’ হিসাবে।

স্ক্যাফোল্ডিং কী?

ভিগট্‌স্কির তাঁর সামাজিক-সাংস্কৃতিক তত্ত্বে সর্বপ্রথম ‘স্ক্যাফোল্ডিং’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ব্রুনার মূলত: ভাইগট্স্কির কাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ১৯৭৬ সালে স্ক্যাফোল্ডিং-এর ধারণাটি সামাজিক গঠনবাদের অংশ হিসেবে তাঁর মতবাদে অন্তর্ভুক্ত করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে এই ধারণাটি বর্তমানে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভিগট্‌স্কির মতে, স্ক্যাফোল্ডিং হলো শিশুর কোনো সমস্যার সমাধান বা উত্তরণের জন্য প্রদত্ত ধারাবাহিক সহায়তা, যা শিশুর অবস্থান বুঝে ধাপে ধাপে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রদান করা হয়। শিখনের ক্ষেত্রে শিশুর অবস্থান বুঝে শিক্ষক বা অপেক্ষাকৃত সক্ষম সঙ্গীর দ্বারা বিভিন্ন অবস্থায় স্ক্যাফোল্ড করা হয়। শিশুকে পরোক্ষভাবে সূত্র, ইঙ্গিত, উপকরণ এবং পরিবেশ দিয়ে ও প্রশ্ন করে সমাধান খুঁজে পেতে সহায়তা করবেন, কিংবা সমস্যার সরাসরি সমাধান করে দেবেন, অথবা তাদেরকে সুযোগ করে দেবেন নিজে থেকে সমস্যাটির সমাধান করতে পারার, যার পুরোটাই নির্ভর করবে শিশুর বিকাশের অবস্থানের  ওপর।

ZPD কী?

ZPD এর পূর্ণরূপ হলো ‘Zone of Proximal Development’ যার বাংলা অর্থ ‘বিকাশের নিকটবর্তী অঞ্চল’ বা ‘দৃঢ়িকরণ’। ভিগট্‌স্কির তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো Zone of Proximal Development (ZPD) ।  ভিগট্‌স্কির মতে জ্ঞানমূলক বিকাশের ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত হয়ে থাকে, যাকে তিনি বলেছেন Zone of Proximal Development । এর অর্থ হলো শিশুর বিকাশ শুরু হতে থাকে যখন সে সামাজিক আচরণে সম্পৃক্ত হয় এবং এর পরিপূর্ণ বিকাশ নির্ভর করে। ZPD হলো কোনো পরিস্থিতি বা সমস্যা যখন শিশুর সামর্থ্য বা চিন্তা ক্ষমতার কিছুটা উপরের স্তরে থাকে তখন শিক্ষক বা পিতা-মাতা অথবা অপেক্ষাকৃত সক্ষম সাথি ইশারা, ইঙ্গিত, উপকরণ, সূত্র ধরিয়ে দিয়ে বা প্রশ্ন করে নিজে থেকে সমাধান খুঁজে পেতে শিশুকে সহায়তা করেন। শিশুর একা কোনো কাজ করার সামর্থ্য এবং অন্যের সাহায্য নিয়ে কাজ করার সামর্থ্যরে মধ্যে যে এলাকা বা স্তর তা-ই ZPD ।

মতামত দিন

নিউজলেটার

থাকার জন্য আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।