শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের প্রভাব

ব্রনফ্রেনব্রেনারের বাস্তুসংস্থান তত্ত্বটি কী?

শিশুর শিখন ও বিকাশে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সাধারণত তার নিকট পরিবেশ থেকে শেখে। শিশুর চারপাশের পরিবেশ তার জীবনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। পরিবেশের প্রভাবের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে, গতানুগতিক ধারণা ও তত্ত্বের বাইরে অনেকটা ব্যতিক্রমধর্মী ও কার্যকরী ধারণার উদ্ভাবন করেন ব্রনফেনব্রেনার নামক একজন শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী। তাঁর এ তত্ত্বটি বাস্তুসংস্থান তত্ত্ব (Ecological System Theory) নামে পরিচিত। তার মতে, শিশু শুধু শিশু নয়, সে একটি পরিবারের অংশ,পাড়ার একজন সক্রিয় সদস্য, আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান (বিদ্যালয়/ ক্লাব/ দলের) সমাজ এবং রাষ্ট্রেরও একজন নাগরিক। এই তত্ত্বের শিশুকে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রতি জোর দিয়ে মতামত ব্যক্ত করা হয়। বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের মূল কথা হলো- শিশুর পরিবেশ, পরিবেশের বিভিন্ন সদস্য ও উপাদান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বৃহত্তর সমাজ ও এগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান সিস্টেম শিশুর শিখন ও বিকাশে প্রভাব বিস্তার করে।

বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের ধাপ কয়টি ও কী কী?

১. মাইক্রো সিস্টেম:

এ চক্রের প্রথম স্তরে শিশুর পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাব, সকল অভিজ্ঞতা, সকল প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সহযোগে মাইক্রো সিস্টেম অংশটি গঠিত। পরিবার, শিশু সেবাকারী এবং সহকারী, বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিশু চিকিৎসাসেবা, সামাজিক সেবা ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। শিশুরা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানও শিশু কর্তৃক প্রভাবিত হয়। যেমন-শিশু তার পরিবারের লোকজন এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্তৃক প্রভাবিত হয়। একইভাবে শিশুর আচরণের ফলে তাদেরও মানসিক পরিবর্তন আসে।

২. মেসো সিস্টেম:

মাইক্রো সিস্টেমে একজন দ্বারা অন্যজনের প্রভাবিত হওয়ার মাধ্যমে বা পারস্পরিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার কারণেই বাস্তবিদ্যার দ্বিতীয় স্তরের সৃষ্টি হয়,যাকে তিনি নাম দিয়েছেন মেসো সিস্টেম। এর মাধ্যমে একটি সম্পর্কের শক্ত ভিত গড়ে ওঠে। মেসো সিস্টেমে যখন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে দৃঢ় সহযোগিতা এবং যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বানুযায়ী শিশুর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।

৩. এক্সো সিস্টেম:

শিশুর উন্নয়নের ওপর প্রভাবকারী পরিবেশের এই ধাপ (এক্সো সিস্টেম) যা ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরস্পর সংযুক্তি ক্সতরি করে, তবে তা শিশুর জীবনকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে না। কিন্তু পরোক্ষভাবে তাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। দেখা যায় যে, অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারি ব্যবস্থা, ধর্মীয় অবস্থা ইত্যাদি প্রত্যক্ষ ভাবে শিশুর সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সহায়তা না করলেও শিশুর পরিবার, পিতা-মাতাকে সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সহায়তা করে, যা পরোক্ষ ভাবে শিশুর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষভাবে শিশুর শিখন ও সার্বিক বিকাশে প্রভাব ফেলে। যেমন-একটি দেশ যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করে, কিংবা বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন বা শিশু অধিকার সম্পর্কে কার্যকরী বিধি-বিধান প্রণয়ন করে, তা শিশুর বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

৪. ম্যাক্রো সিস্টেম:

এটা বা সংস্থান চক্রের শেষ বা চূড়ান্ত ধাপ। এখানে মূলত সমাজে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও আদর্শের দিকগুলোর কথা বলা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় শিশুর উন্নয়নে এর সংশ্লিষ্টতা নেই, কিন্তু বাস্তবে শিশুর সার্বিক উন্নয়নে এর গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। যেমন-যে সমাজে শিশু নির্যাতনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় সেখানে শিশু নির্যাতনের ঘটনা কম ঘটে। একইভাবে যে সমাজ বা রাষ্ট্র শিশুর বিকাশের উপযোগী আইন তৈরি করে সেখানে শিশু যেভাবে বেড়ে উঠবে, যে সমাজে এ ধরনের সংস্কৃতি ও মূলবোধ নেই সেখানে অন্যভাবে বেড়ে উঠবে।

৫. ক্রোনো সিস্টেম:

এটি ইউরি ব্রনফেনব্রেনার কর্তৃক প্রদত্ত কোনো ধাপ নয়। পরবর্তীতে বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের ধাপগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, শিশু এসব ধাপ দ্বারা সৃষ্ট প্রভাবের বাইরেও কোনো ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। যেমন-পারিবারিক বিপর্যয়, সামাজিক বিপর্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি বিষয় শিশুকে প্রভাবিত করে। বলা হয়ে থাকে, যে কোন প্রাকৃতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিপর্যয়ে শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন, যখন বাবামায়ের মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে অথবা সামুদ্রিক জলোচ্ছাস হয় তখন শিশুরাই মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। এসব ঘটনাকে ক্রোনো সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের প্রভাব

বাস্তুসংস্থান তত্ত্বটি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শিশুকে শুধু একক শিশু হিসেবে না দেখে তাকে পরিবারের, গ্রাম, বন্ধু-বান্ধব, বিদ্যালয়, রাষ্ট্র ও সমাজের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শিশু-বান্ধব শিখন ও বিকাশ উপযোগী পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি, রাষ্ট্র ও সমাজ উপহার দেয়া যা তাকে সার্বিক বিকাশে বিকশিত করে তুলতে সহায়তা করে। সুতরাং শিক্ষাক্ষেত্রে বা বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তত্ত্বের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বাস্তুসংস্থান তত্ত্বের  কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • শিশু যে পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে সেই পরিবেশের যাবতীয় উপাদান শিশুটির বিকাশ ও শিখনে প্রভাব ফেলে।
  • শিশুর লালন-পালনের সাথে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে শিশুটির বেড়ে উঠার প্রভাব থাকে বিধায় এগুলো তার শিখনে প্রভাব ফেলে।
  • শিশুটি যখন বড় হতে থাকে তখন তার আশপাশে যে সমস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থাকে তারা শিশুটির বিকাশে ভূমিকা রাখে।
  • সমাজের সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি ইত্যদির প্রভাবও শিশুটির ওপর পড়তে থাকে।
  • রাষ্ট্রীয় নীতিমালা কেমন তার ওপর নির্ভর করে শিশুটির সাথে বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কী ধরনের আচরণ করছে বা সেবা প্রদান করছে এ সবই শিশুর আচরণ গঠনে সহায়তা করে।
  • শিক্ষাক্ষেত্রে পাঠ্যপুস্তক কেমন হবে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক কেমন আচরণ করবেন, পাঠদান পদ্ধতি কেমন হবে এতদ্সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় ঐ দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।
  • কোনো রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও শিশুদের বেশি প্রভাবিত হতে দেখা যায়।

পরিশেষে বলা যায় যে, শিশুর নানাবিধ বিকাশে বাস্তুসংস্থানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। সুতরাং শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তুসংস্থানের এসকল প্রভাব শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ণ থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।

মতামত দিন

নিউজলেটার

থাকার জন্য আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।