এম.এড

শিখনক্রম ও আবশ্যকীয় শিখনক্রম

Learning Continuum and Essential Learning Continuum

শিখনক্রম ও আবশ্যকীয় শিখনক্রম বলতে কী বুঝায়?

সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় বিদ্যালয়ে ভর্তিকৃত সকল শিশুর সামর্থ্য ও চাহিদার প্রতি সচেতন দৃষ্টি রেখে আবশ্যকীয় যোগ্যতাগুলো ১২ টি বিষয়ের শিখনক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে৷ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিশুই বিষয়ভিত্তিক শিখনক্রমে উপস্থাপিত এ যোগ্যতাগুলো পুরোপুরিভবে অবশ্যই অর্জন করতে হবে৷ এ জন্য এ শিখনক্রমকে আবশ্যকীয় শিখনক্রম বলা হয়েছে৷ জানা থেকে অজানা, সহজ থেকে কঠিন, আংশিক থেকে সম্পূর্ণ নীতির উপর ভিত্তি করে আবশ্যকীয় শিখনক্রম প্রণীত হয়েছে৷ নিম্নে শিখনক্রম ও আবশ্যকীয় শিখনক্রম সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো :

শিখনক্রম

প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জনের প্রক্রিয়া প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী শ্রেণীগুলোতে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পঞ্চম শেণীতে সমাপ্ত হয় বিধায় যে কোন প্রান্তিক যোগ্যতার কতটুকু (কি পরিমাণ) প্রতি শ্রেণীতে অর্জিত হতে পারে তাও নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এরূপ যে কোন একটি প্রান্তিক যোগ্যতাকে প্রথম শ্রেণী থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়ায় টেনে নিয়ে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পৌঁছানোকে শিখনক্রম (লার্নিং কন্টিনিউয়াম) বলা চলে। অর্থাৎ যে কোন একটি যোগ্যতার মাত্রা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর শেষে কি দাঁড়াতে পারে তা নির্ধারণ করা হয় এবং যোগ্যতার এ ধারাবাহিকতাই শিখনক্রম।

আবশ্যকীয় শিখনক্রম

শিখনক্রম প্রণয়নকালে আশা করা হয়েছে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিশুই নির্ধারিত শিখনক্রমগুলোর মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে যোগ্যতাগুলো অবশ্যই অর্জন করবে। এ জন্য এ শিখনক্রমগুলোকে আবশ্যকীয় শিখনক্রম (Essential Learning Continuum বা সংক্ষেপে ELC) বলা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের ১১টি বিষয়ের এরূপ শিখনক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষাক্রম-২০১২ অনুসারে প্রাথমিক স্তরের সকল বিষয়ের আবশ্যকীয় শিখনক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে।

নিচে বাংলা বিষয়ের একটি শিখনক্রম (ছক-১) উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হল। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় বিদ্যালয়ে ভর্তিকৃত সকল শিশুর সামর্থ্য ও চাহিদার প্রতি সচেতন দৃষ্টি রেখে অতি আবশ্যকীয় যোগ্যতাগুলো উপরিউক্ত ১১টি বিষয়ের শিখনক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আশা করা হয় যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিশুই প্রণীত শিখনক্রমগুলোর মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে এ আবশ্যকীয় যোগ্যতাগুলো অর্জনের সুযোগ পাবে। এই জন্য এ শিখনক্রমগুলোকে আবশ্যকীয় শিখনক্রম (Essential Learning Continuum) বলা হয়। এই আবশ্যকীয় শিখনক্রমগুলো অনুযায়ী বিষয় ও শ্রেণীভিত্তিক নির্ধারিত জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ অর্জনের প্রতি সচেতন দৃষ্টি রেখে যথাযথ পদ্ধতিতে পাঠদান ও শিশুর অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হয়।

আবশ্যকীয় শিখনক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষায় নমনীয় প্রমোশন নীতির সফল বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার অর্জিত মানের তারতম্যও বিদূরিত হবে বলে আশা করা হয়। বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরের যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম ১৯৯২ সালে প্রথম শ্রেণীতে এবং পর্যায়ক্রমে ১৯৯৬ সালে পঞ্চম শ্রেণীতে প্রবর্তন করা হয়। এরমধ্যে দশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। সময়ের চাহিদার সঙ্গে প্রচলিত শিক্ষাক্রম অনেক ক্ষেত্রে তাল মিলাতে পারছে না বলে ছাত্র-শিক্ষক ও গবেষকগণ মন্তব্য করছেন এবং মন্তব্য যথাযথ বলে অনেকাংশে প্রমাণিত হয়েছে।

আবশ্যকীয় শিখনক্রম; বিষয় : বাংলা

শ্রেণিভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা

বিষয়ভিত্তিক প্রান্তিক যোগ্যতাপ্রথম শ্রেণিদ্বিতীয় শ্রেণি  তৃতীয় শ্রেণিচতুর্থ শ্রেণিপঞ্চম শ্রেণি
শোনা দক্ষতা:  

১. বাংলা ভাষার গঠন- বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করা।
১.১ বাক্য ও শব্দে ব্যবহৃত বাংলা বর্ণমালার ধ্বনি ও নির্বাচিত যুক্তবর্ণের ধ্বনি মনোযোগ সহকারে শুনবে।  

১.২ কারচিহ্নহীন ও কারচিহ্নযুক্ত শব্দ এবং অনুরূপ শব্দযোগে বাক্য শুনবে।  

১.৩ নির্দেশনা, প্রশ্ন, অনুরোধ ইত্যাদি শুনে বুঝতে পারবে।
১.১ বাক্য ও শব্দে ব্যবহৃত বাংলা যুক্তবর্ণের ধ্বনি মনোযোগ সহকারে শুনবে।  

১.২ বিভিন্ন শব্দ ও ছোট ছোট বাক্য শুনে বুঝতে পারবে।  

১.৩ নির্দেশনা, প্রশ্ন, অনুরোধ শুনে বুঝতে পারবে।  
১.১ বাংলা বর্ণ ও যুক্তবর্ণ সহযোগে গঠিত শব্দ শুনে বুঝতে পারবে।  

১.২ পরিচিত ও পাঠে ব্যবহৃত শব্দ দিয়ে গঠিত বাক্য শুনে বুঝতে পারবে।  

১.৩ নির্দেশনা, প্রশ্ন, অনুরোধ, ঘোষণা শুনে বুঝতে পারবে।
১.১ বাংলা যুক্তবর্ণ সহযোগে গঠিত শব্দ শুনে বুঝতে পারবে।  
১.২ সহজ বাক্য শুনে বুঝতে পারবে।  

১.৩ নির্দেশনা, প্রশ্ন, অনুরোধ, ঘোষণা, আদেশ শুনে বুঝতে পারবে।
১.১ বাংলা যুক্তবর্ণ সহযোগে গঠিত শব্দ শুনে বুঝতে পারবে।  

১.২ সহজ বাক্য শুনে বুঝতে পারবে।  

১.৩ নির্দেশনা, প্রশ্ন, অনুরোধ, ঘোষণা, আদেশ, উপদেশ শুনে বুঝতে পারবে।  

ছক-১: আবশ্যকীয় শিখনক্রম বাংলা

আবশ্যকীয় শিখনক্রমভিত্তিক শিখন-শেখানো কার্যাবলি:

  • প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি: বাস্তব, অর্ধবাস্তব এবং বিমূর্ত এ তিনটি অনুসরণে পাঠ আয়োজনের লক্ষ্যে শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দান।
  • প্রথম অবস্থায় শিক্ষার্থীর শিখনের গতি ধীর হয় এ কথা মনে রেখে যেন পাঠদানের আয়োজন করা হয় সে বিষয়ে শিক্ষকগণকে প্রশিক্ষণকাল অবহিত করা হয়েছে।
  • পাঠে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ কিভাবে নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে শিক্ষকগণকে প্রশিক্ষণ দান করা হয়েছে। (আবশ্যকীয় শিখনক্রম ভিত্তিক শিখন- শেখানো কার্যক্রম গ্রন্থের সহায়তা নেয়া যায়)।
  • পাঠের একঘেয়েমী দূরীকরণ ও উৎসাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পাঠে মাঝে মাঝে শ্রেণীকক্ষের বাইরে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কিভাবে পাঠদান করা যায় সে সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দান করা হয়েছে।
  • শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে নিকট পরিবেশ থেকে সংগৃহীত উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রদর্শনী পাঠদান।
  • খেলার ছলে ও গল্প বলার মাধ্যমে পাঠদান করা। এ ছাড়া আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ পাঠদানের অভিজ্ঞতায় অনেক সমৃদ্ধ। তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েও শ্রেণীপাঠকে অধিকতর কার্যকর করতে পারেন।

মতামত দিন

নিউজলেটার

থাকার জন্য আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।