শিশুর বিকাশে পরিবেশের ভূমিকা
শিশুর বিকাশে পরিবেশের
ভূমিকা
The Role of
Environment in Child Development
শিশুর বিকাশে তার পরিবারের
পাশাপাশি তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ভূমিকাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশু কোন
বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে, তার সাথে তার
শিক্ষকদের সম্পর্ক কেমন, তার খেলার
সাথীদের সাথে সে কী খেলে, কীভাবে মেশে, তার বাবা-মায়ের সাথে তার শিক্ষকদের কেমন সম্পর্ক এরকম
বিভিন্ন বিষয় শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
এমন কি বড় হবার পর তার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সে কীরকম আচরণ করবে, কী সিদ্ধান্ত নিবে তা অনেকাংশেই নির্ভর করে পরিবার এবং
পরিবেশের এই সমস্ত উপাদান শিশুর উপর কীভাবে এবং কতখানি প্রভাব ফেলে তার উপর।
শিশুর আচরণ এবং তার প্রয়োজনকে
সঠিকভাবে বুঝতে হলে তাই তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে হবে। এ
প্রসঙ্গে রাশিয়ান-আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ইউরি ব্রনফেনব্রেনার (Urie
Bronfenbrenner) পরিবেশের এই সামগ্রিক
প্রভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন যা বাস্তুসংস্থান তত্ত্ব
(Ecological System Theory) নামে পরিচিত।
ব্রনফেনব্রেনারের এই
তত্ত্বমতে শিশুর উপর তার এই পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব প্রধানত চারটি স্তরে কাজ করে।
ব্রনফেনব্রেনারের
চারটি স্তর:
ক)
মাইক্রো সিস্টেম,
খ)
মেসো সিস্টেম:
গ)
এক্সো সিস্টেম:
ঘ)
ম্যাক্রো সিস্টেম:
ক) মাইক্রো
সিস্টেম:
এই স্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে
থাকে শিশু। শিশু তার দৈনন্দিন জীবনে যাদের কিংবা যে সকল প্রতিষ্ঠানের সরাসরি
সংস্পর্শে আসে সেই সমস্ত মানুষ বা প্রতিষ্ঠান তার এই মাইক্রো সিস্টেমের উপাদান।
মা-বাবা,
ভাই-বোন, খেলার সাথী, বিদ্যালয়, শিক্ষক, ডেকেয়ার
সেন্টার ইত্যাদি এই স্তরের অন্তর্ভূক্ত। শিশুর আচরণ এবং জীবনের প্রতি তার
দৃষ্টিভঙ্গী গঠনের ক্ষেত্রে এই উপাদানগুলি যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে- শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষে শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল
আচরণ করেন, তবে পড়াশোনার প্রতি
শিশুর একটি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠবে। তেমনি বাবা-মায়ের সাথে শিশুর সুসম্পর্ক
তাকে পরবর্তীতে দায়িত্বশীল একজন মানুষে পরিণত করবে।
খ) মেসো
সিস্টেম:
এই স্তরে মাইক্রো সিস্টেমের
উপাদানগুলো পরস্পরের সাথে যেভাবে মিথষ্ক্রিয়া করে এবং তার ফলশ্রুতিতে শিশুর উপর
যে প্রভাব পড়ে তা বর্ণনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে- যখন কোন
শিশুর বাবা-মা নিয়মিত তার বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন, সেই শিশুর পড়ালেখায় তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। একইভাবে, মাইক্রো সিস্টেমের উপাদানগুলির মধ্যে যদি ইতিবাচক
মিথষ্ক্রিয়া না হয়, তবে তা শিশুর
জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গ) এক্সো
সিস্টেম:
এই স্তরে রয়েছে সেই সমস্ত
ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাদের প্রভাব শিশুর জীবনে প্রত্যক্ষভাবে না পড়লেও
পরোক্ষভাবে পড়ে থাকে। যেমন- দূর সম্পর্কের আত্নীয়, বাবা-মায়ের কর্মক্ষেত্র, দেশের শাসন ও
বিচার ব্যবস্থা, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা
ইত্যাদি। যেমন- এটা খুবই স্বাভাবিক যে উন্নত দেশের শিশুদের তুলনায় অনুন্নত দেশের
শিশুরা পড়ালেখার ক্ষেত্র কম সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে যা তার পরবর্তী জীবনেও
প্রভাব বিস্তার করে।
ঘ)
ম্যাক্রো সিস্টেম:
যে রাষ্ট্রে বা সমাজে শিশু বাস
করে তার সামগ্রিক কৃষ্টি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, আইন ইত্যাদি বাস্তুসংস্থান তত্ত্বেও সর্বশেষ স্তর। এই সমস্ত উপদানের
দ্বারাও শিশুর জীবন গভীরভাবে প্রভাবিত হতে পারে। যেমন- যে দেশে বাল্যবিবাহ বহুল
পরিমাণে প্রচলিত, সে দেশের
মেয়ে শিশুর পড়ালেখার পথে অনেক বেশি প্রতিবন্ধকতা থাকে।
ক্রোনো
সিস্টেম:
- এই স্তরটি পরবর্তীতে সংযোজিত হয়েছে। মানব শিশুর
উন্নয়নের ধারাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে উপরের চারটি স্তরের উপাদান
ছাড়াও তার জীবনে কোন বিশেষ ঘটনা বা সময়ের খুব বড় প্রভাব থাকতে পারে।
- যেমন- কোন প্রিয়জনের মৃত্যু; অথবা প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ শিশুর বেড়ে ওঠা বা তার
পড়াশুনার গতি-প্রকৃতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Ecological_systems_theory
- http://psychologydos.weebly.com/psych-journal/journal-8-urie-bronfenbrenners-ecological-systems-theory
মতামত দিন